উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা

48

এবার ভরা বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির দেখা সেভাবে না মিললেও মধ্য আশ্বিনে এসে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মৌসুমি বায়ু। বৃষ্টি ঝরছে প্রকৃতির ইচ্ছেমতো। এতে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে বন্যার। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের মধ্যে এবং গঙ্গা অববাহিকার উজানে ভারতীয় অংশে অক্টোবর মাসের শুরুতে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে মাঝারি থেকে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যাপূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্র। বন্যা পূর্বাভাসকেন্দ্রের ‘সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের বন্যাপূর্বাভাস সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন’ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে গঙ্গা অববাহিকার উজানের ভারতীয় অংশে মৌসুমি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে গঙ্গার বাংলাদেশ অংশের পানি সমতলে বাড়ছে। মধ্যবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে এলেও মাসের চতুর্থ সপ্তাহের শেষার্ধ থেকে ভারতের বিহার প্রদেশের কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিসহ অনেক স্থানে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া আমাদের সময়কে বলেন, অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের প্রভাবে গঙ্গার পানি বাংলাদেশের রাজশাহী ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এবং গড়াই নদীর পানি গড়াই রেলওয়ে ব্রিজ ও কুমারখালী পয়েন্টে চলতি সপ্তাহে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।

এতে চলতি সপ্তাহে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা ও গড়াই নদীসংলগ্ন দেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী ও মাগুরা জেলার কিছু স্থানে মাঝারি মাত্রার স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি বন্যাপরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, গঙ্গার পানি বৃদ্ধির কারণে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পদ্মা নদী গোয়ালন্দ ও ভাগ্যকুল পয়েন্টে এবং নদীসংলগ্ন যমুনা আরিচা পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পদ্মা নদীসংলগ্ন দেশের মধ্যাঞ্চলের মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদ-নদীর পানি বর্তমানে কমছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতজনিত কারণে চলতি সপ্তাহের শেষার্ধে এ অববাহিকার নদীগুলোর পানি বাড়তে পারে, তবে বিপদসীমা অতিক্রম করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া।

বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে গত কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশেই বৃষ্টি হচ্ছে। সোমবার সকাল ৯টা থেকে ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছেÑ রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ থেকে মৌসুমি বায়ু (বর্ষা) পুরোপুরি বিদায় নিয়ে থাকে।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পর্যবেক্ষণ বলছে, পদ্মা ও গঙ্গার অববাহিকায় অতিবৃষ্টির কারণে দেশের মধ্যাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশের প্রধান প্রধান নদীতে পানি বেড়েছে। ভারত ফারাক্কার ১০৯টি গেট খুলে দেওয়ায় এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে না পাউবো। পাউবোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো খুলে রাখা হয়। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। গেট খোলা রাখার কারণে বন্যার শঙ্কা নেই। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্রের নিয়মিত তথ্যবিবরণীতে জানানো হয়Ñ রাজশাহী, শরীয়তপুর, মাদারীপুর এলাকার নদীর পানি বাড়ছে।

রাজশাহীর চরাঞ্চল ছাড়ছেন কয়েক হাজার মানুষ

ভারতের বিহার, মালদহ ও উত্তর প্রদেশ থেকে আসা ঢলে রাজশাহীর পদ্মায় বেড়েই চলেছে পানি। এতে রাজশাহীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে জেলার চারটি উপজেলার চরাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ পনিবন্দি হয়েছে পড়েছে। ইতোমধ্যেই তারা চরাঞ্চর ছাড়তে শুরু করেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৬ টায় রাজশাহী পয়েন্টে পদ্মায় পানির উচ্চতা ছিল ১৮ দশমিক ০৪ মিটার। আর বিকাল ৫টায় পদ্মার পানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ১০ মিটার। অর্থাৎ ১১ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে ৬ সেন্টিমিটার।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বলেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত রাজশাহীর চারটি উপজেলার চররাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। যাদের মধ্যে মঙ্গলবার ৬০০ পরিবারকে চরাঞ্চল থেকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া হয়েছে। এ কাজ অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে। সরিয়ে নেয়া লোকজনকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এদের অধিকাংশের উচু এলাকায় নিজের বাড়ি বা আত্মীয়স্বজন রয়েছেন, সেখানেও অনেকে গিয়ে উঠছেন।

কুষ্টিয়ার ২টি উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রতি ঘন্টায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা ।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে কুষ্টিয়া হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদ সীমার ১৪.২৫ পেরিয়ে ২ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বর্তমানে ১৪.২৭ সে.মি পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গত দুই দিনে কুষ্টিয়ার দেীলতপুর এবং খোকসা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে । এছাড়া নদী ভাঙন অব্যাহত আছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের মাঝে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী পৌছে দিতে না পারায় চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। দু’দিন ধরে ভারি বর্ষণ হওয়ায় নি¤œ এলাকা ডুবে গেছে । খাদ্যাভাব ও গো-খাদ্যের অভাবে নাকাল প্লাবিত এলাকার মানুষ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা ৩৫ সেমি ও মহানন্দা ২৯ সেমি বিপদসীমার নিচে

উজান থেকে ধেয়ে আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা ও মহানন্দার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পদ্মার পানি বিপদসীমা হচ্ছে ২২ দশমিক ৫০ সেমি ও মহানন্দা ২১ মিটার। মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত পদ্মার পানি ৬ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে ২২.১৫ সেমি ও মহানন্দায় ১৯ সেমি পানি বৃদ্ধি ২০ দশমিক ৭১ সেমি নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে। এতে করে নতুনভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার চরমোহনপুর ও নামোশংকরবাটি বড়িপাড়া ও জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে পরিবারগুলো ।

পাবনার পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল দশটায় বিপদসীমা ১৪ দশমিক ২৫ সেন্টিমিটার অতিক্রম করে। আর গত ২৪ ঘন্টায় পদ্মায় পানি বেড়েছে ১৬ সেন্টিমিটার। গতকাল সন্ধ্যা ৬ টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৪ দশমিক ২৮ সেন্টিমিটার অতিক্রম করেরছ। বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি।

এদিকে, পদ্মায় পানি বাড়ার কারণে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ঈশ^রদী উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের নিমাঞ্চলের মানুষ। ডুবে গেছে শীতকালীন সবজি, আখ, কলা বাগানসহ বিভিন্ন ফসল। অনেকে বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, পানি বাড়লেও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা নেই। কিছুদিনের মধ্যে পানি নেমে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে এই পানি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী ও কুষ্টিয়া; চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা প্রতিনিধি
সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here