জাতিসংঘ অধিবেশন ও বিশ্ব বিজয়ী শেখ হাসিনা

74

জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান ও নিউইয়র্কে কয়েকটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করে ১ অক্টোবর দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ^ব্যাপী একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। এবারও (২০১৯) জাতিসংঘে তিনি তার সরকারের সাফল্যের কথা উপস্থাপন করেছেন। ২০০৯ থেকে টানা ভাষণ দিয়েছেন সাধারণ অধিবেশনে। ২৭ সেপ্টেম্বরের ভাষণটি ছিল ১১তম ভাষণ। সর্বমোট ক্ষমতার ১৬ বছরে ১৪তম ভাষণ। কারণ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ ক্ষমতাকালীন দুটি অধিবেশনে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। সামাজিক কার্যক্রম, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের জন্য তাকে অসংখ্য সম্মাননা ও অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে। জাতিসংঘে ২৭ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের মাত্রা অনুধাবন করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে তাগিদ দেন। এ সংকটের সমাধানে নতুন করে চার দফা প্রস্তাব তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। একই দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক হয়। এ ছাড়া এই সফরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমার সঙ্গেও তার বৈঠক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সফরে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সম্মাননা পেয়েছেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই) তাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভূষিত করেছে। আর তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ তাকে ভূষিত করেছে ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুুথ’ সম্মাননায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ’ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বহুপক্ষীয় প্যানেল আলোচনাও পরিচালনা করেন শেখ হাসিনা। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ হলে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট’-এ বক্তব্য রাখেন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং ওআইসি সচিবালয় আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেনÑ যেখানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদও উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুদা, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি ও ইউনেস্কোর সাবেক মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভাও আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এক্সন মবিল এলএনজি ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান অ্যালেক্স ভি ভলকোভও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মাইক্রোসফটের প্রধান বিল গেটস।

দুই.

রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় রয়েছে শেখ হাসিনার। উল্লেখ্য, ৭ জানুয়ারি (২০১৯) এ দেশের জন্য একটি ‘ঐতিহাসিক ক্ষণ’ বিস্ময় নিয়ে দেখা দিয়েছিল। ওইদিন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা হন হ্যাটট্রিকসহ চারবারের প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। আর দল হিসেবে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে এগিয়ে যাওয়ার মূলমন্ত্রে উদ্দীপ্ত। সব কিছুর শিকড় রয়েছে শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের ভেতর। বিশ্বের অন্যতম উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও গত ১০ বছরে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ সম্ভব। তিনি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলেছেন জনমানুষের কল্যাণে। তিনি বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় রয়েছেন এবং অতীতে নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে বিশ্বের সেরা দশ ক্ষমতাধর নারীদের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন। ক্ষমতাধর এশীয় নারীদের তালিকায় তিনি শীর্ষে অবস্থান করছেন। ২০১৯ সালে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী। অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস মোকাবিলার সাফল্যেই শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা বেড়ে যায়Ñ যার ফল হলো ৩০ ডিসেম্বরের (২০১৮) নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামো নির্মাণ, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমন, ধর্মনিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। এ পর্যন্ত কোনো হামলা-হুমকি ও বাধা শেখ হাসিনাকে লক্ষচ্যুত করতে পারেনি। অকুতোভয় সাহসী জননন্দিত শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে উন্নয়নের মডেল হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তার রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বপরিসরে নতুন মর্যাদায় অভিষিক্ত।

তিন.

প্রকৃত অর্থে ‘আমার বাংলাদেশ, আমার ভালোবাসা’Ñ এই অমৃতবাণী বাংলাদেশের একজনই উচ্চারণ করেছেন। তিনি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত। সততা, নিষ্ঠা, রাজনৈতিক দৃঢ়তা; গণতন্ত্র, শান্তি, সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের অনন্য রূপকার আর মানবকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ- এর চেয়েও আরও আরও অনেক কিছু তিনি। দরদি নেতা দুঃখী মানুষের আপনজন, নির্যাতিত জনগণের সহমর্মী তথা ঘরের লোক। তিনি বলেছেন, ‘বাবার মতো আমাকে যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয়, তা হলে আমি তা করতে প্রস্তুত।’ শান্তির অগ্রদূত শেখ হাসিনা দেশের মানুষের জন্য নিজের প্রাণকে তুচ্ছ করতে পারেন নির্দ্বিধায়। সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভরসার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। এ জন্য তার অনুপস্থিতি কারও কাম্য হতে পারে না। ধৈর্য ও সাহসের প্রতিমূর্তি শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের মানসকন্যা, দেশরতœ, কৃষকরতœ, জননেত্রী- বহুমাত্রিক জ্যোতিষ্ক। তাকে কেন্দ্র করে, তার নেতৃত্বে আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশের সব কিছু। ২০১৭ সালে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে এ দেশে আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্ববাসী এখন তার মানবিক আচরণে অবিভূত।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে শেখ হাসিনা এক আশ্চর্য সাহসী রাজনীতিকের নামÑ যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলেছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনাবিহীন যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ জন্য তরুণ প্রজন্ম ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি-জামায়াত তথা ঐক্যফ্রন্টকে। আবার নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার বীভৎস চিত্র গণমানুষকে আতঙ্কিত করে তোলায় তারা আওয়ামী লীগের ধারাবাহিকতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এদিক থেকে ৩০ ডিসেম্বরের (২০১৮) নির্বাচন আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। বিএনপির অবরোধ-হরতাল-নাশকতার কথা মানুষ ভুলে যায়নি এখনো। অতীতে সহিংসতা আর জ্বালাও-পোড়াও করে অতীতে তারা থামাতে পারেনি যুদ্ধাপরাধের বিচার। বরং কুখ্যাত অপরাধীদের ফাঁসির রায় জনগণকে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থাশীল করে তুলেছে অনেক বেশি। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে ঐক্যফ্রন্টের বাঁচা-মরার আন্দোলনও দমে গেছে। শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, কূটনীতিক দিক থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। তিনি মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সব বিরূপ পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছেন। ২০১৯ সালে তার মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন তরুণ কিন্তু অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা। কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগী এবং অংশীদার বানিয়ে ফেলেছেন রাশিয়া ও জাপানকে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। পূর্বমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার ফলে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনের পরই অভিনন্দন জানিয়েছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে উপস্থাপন করে প্রশংসিত হয়েছেন শেখ হাসিনা।

চার.

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবেÑ এটি নিশ্চিত। তাই আওয়ামী পরিবারের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সব অশুভ শক্তির মোকাবিলা করতে হবে। সামনে বাধা এলে তা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলায় সচেষ্ট থাকতে হবে। ’৭১-এর পরাজিত শক্তিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশের স্বাধীনতা ও স্বপ্নকে হত্যা করতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা জীবিত রয়েছেন। তিনিই তার পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ’৭১-এর পরাজিত শক্তিরা বসে নেই। ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। তাই সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আর মহাকাল তার নেতৃত্বকে স্মরণ করবে শ্রদ্ধাভরে।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here