বারবার চোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসছে : চঞ্চল চৌধুরী

76

হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে বিশেষ একটা দিন ‘ভাইফোঁটা’। এদিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে, ছড়া কেটে বলে-

‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা। যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা। যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে যম হলো অমর। আমার হাতে ফোঁটা খেয়ে আমার ভাই হোক অমর।’

ভাইফোঁটার বিশেষ এই দিনে পরিবারের সঙ্গে নেই জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ ছবির শুটিংয়ের কারণে বর্তমানে তিনি অবস্থান করছেন সেন্টমার্টিনে। বিশেষ এইদিনে ভাই-বোনদের কথা স্মরণ করে, মন ভালো নেই তার। তাই শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে ফেসবুকে মনপুরা’খ্যাত এই অভিনেতা লিখেছেন- ‘ভাইফোঁটা…

আমার বোনদের নিয়ে কোনোদিন তেমন কিছু লেখা হয়নি। আমরা পাঁচ বোন ও তিন ভাই। আমি সবার ছোট, অনেক আদরের। পাঁচ বোনকে ডাকি দিদি, মনদি, রাঙাদি, সোনাদি, খুকদি। আজ আমি বা আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সকল কৃতিত্ব আমার এই ভাইবোনদের। আমার বাবা-মা যে কত কষ্ট করে প্রত্যেকটা সন্তানকে বড় করেছে, সে সব আজ অতীত। আমার মা-বাবার সাথে আমাদের এই জীবন যুদ্ধে প্রথম সঙ্গী হয়েছিল আমার বড় দিদি ও তার শ্বশুরবাড়ির পরিবার। আমরা প্রায় সবগুলো ভাইবোন কমবেশি পড়ালেখা করেছি।

আমার দিদির বাড়ি বেলগাছী রাজবাড়ীতে। তারপর আমার মনদি তার ছোট্ট চাকুরির সবটুকু বেতন দিয়ে, সোনাদি তার শ্বশুড়বাড়ি থেকে জমানো-লুকানো টাকা দিয়ে আমাদের পড়ালেখার খরচ চালিয়েছে। আমাদের বোনদের শ্বশুড়বাড়ির আত্মীয়রা আসলে মানুষ নয়, তারা দেবতা…’

চঞ্চল চৌধুরী আরও লিখেছেন, ‘আমার বড়দিদি আসলে মাতৃরুপী দূর্গা। শুধু আমাদের ভাইবোন নয়, আমাদের সন্তানদেরকেও এখনো লালন-পালন করে চলছে। আমি আমার নতুন সিনেমা “হাওয়া”র শুটিংয়ে এখন সেন্টমার্টিনে সাগরের মাঝখানে। অনেকদিন এখানে থাকতে হবে। প্রায় প্রতিদিনই আমার কোনো না কোনো বোন ভাই আমাকে ফোন করে বলবে, “এ ভাই তুই খাইছিস, এ ভাই তুই রুমে আইছিস, এ ভাই তুই ঘুমাইছিস, এ ভাই তোর শরীল ভালো আছে?” আমি শুধু হ্যাঁ হ্যাঁ করি আর ফিরে যাই সেই ছোটবেলায়। কারণে-অকারণে কতবার জড়িয়ে ধরতাম তোমাদের।’

বোনদের সঙ্গে ছোটবেলার স্মৃতি টেনে তিনি লিখেছেন- অনেক দুষ্টু ছিলাম ছোটবেলায়, এখন কিছুটা কমেছে। আমার ছোটদিদি খুকদির সাথে প্রায় প্রতিদিন রুটিন করে মারামারি করতাম। মাছের গাদা পেটি নিয়ে, ডিম ভাগাভাগি নিয়ে, বই নিয়ে। ও আমার এক ক্লাস উপরে পড়তো, পিঠাপিঠি ভাইবোন আমরা। আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগতো, আমি কোনোদিন স্কুলে নতুন বইয়ের মালিক হতে পারিনি। খুকদিকে বাবা যে পুরনো বই কিনে দিত, ওর এক বছর পড়ার পর সেই ছেড়া লুচি বইগুলো আমাকে পড়তে হতো। এ কারণেই ওর সাথে বেশি মারামারি হতো। আর আমার রাঙাদি ছোটবেলা থেকেই মাটির মানুষ। মমতায় ভরা মুখ, আমার সাথে কথা বলতে বলতেই কেঁদে ফেলে। পড়ালেখায় খুব মেধাবী ছিল।’

চঞ্চল আরও লিখেছেন- ‘আমার ছেলেকে এখন রাঙাদি প্রায়ই স্কুল থেকে নিয়ে আসে। বৃন্দাবন দা আর খুশী (নাট্যকার-অভিনেতা বৃন্দাবন দাস ও তার স্ত্রী অভিনেত্রী শাহানাজ খুশি) প্রথম যে বার আমাদের গ্রামের বাড়িতে যায়, তখন বলেছিলেন, “তুমি ভাগ্যবান, এমন ভাইবোন, বাবা-মা পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।” আসলেই তাই, আমার শতজনমের সৌভাগ্য, আমি এমন বোনদের ভাই হয়ে জন্মেছি।’

ভাইফোঁটার প্রসঙ্গ টেনে চঞ্চল লিখেছেন, ‘আজ ভাইফোঁটা। অন্তত শত ব্যস্ততার মধ্যেও তোমাদের আশীর্বাদ আর আদরের স্পর্শ পেতে তোমাদের কাছে যাই। ছোটবেলার মতোই এখনও তোমাদের জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করে। এবার তোমাদের ভাইফোঁটা নিতে পারলাম না। এজন্য এই লেখাটা লিখতে গিয়ে, বারবার চোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসছে। বিশাল এই সমুদ্রের মাঝখান থেকে এটুকু খুব ভালো করেই বুঝি, আমার প্রত্যেকটা বোনের মন সমুদ্রের চেয়ে বড়। আকাশের চেয়ে উদার। আবার যদি জন্ম নেই, তোমাদের মতো ভাই-বোনের ভাই হয়েই যেন জন্মাই। আমার কাছে তোমরা আমার শুদ্ধ’র মতই। অনেক আদরের, অনেক ভালোবাসার।’
সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here