মির্জাপুরে এসপির তৎপরতায় ছাত্রীকে গণধর্ষনের ঘটনায় মামলা ডিবিতে মুল দুই আসামী রিমান্ডে

169

মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল :
পুলিশের মহা পরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. হাবিবুর রহমান এবং টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মি. সঞ্জিত কুমার রায়ের নির্দেশে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ছাত্রীকে গণধর্ষনের ঘটনার ৬ দিন পর গতকাল সোমবার রাতে মির্জাপুর থানায় মামলা হয়েছে। থানায় মামলা রেকর্ড হওয়ার পর পরই টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়ের নির্দেশনায় মামলা অধিক তদন্তের জন্য ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা ডিবি পুলিশ (দক্ষিণ) গুরুত্বপুর্ন এই ধর্ষন মামলাটি তদন্ত করছেন। আজ মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের ডিবি পুলিশ (দক্ষিণ) গ্রেফতারকৃত ধর্ষন মামলার দুই আসামী মুল হোতা সোহানুর রহমান সোহান সিকদার (২৬) ও রাকিবুল ইসলাম সিকদার রাকিব (২৭) কে রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে হাজির করলে আদালতের বিচারক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই আসামীকে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বলে টাঙ্গাইল ডিবি দক্ষিনের (ওসি) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মি. শ্যামল কুমার দত্ত রাতে এই প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন। এছাড়া ভিকটিমকে আদালতে হাজির করে জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। শারীরিক ভাবে সে অসুস্থ থাকায় দুই এক দিনের মধ্যে তাকে ডাক্তারী পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে ছাত্রীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গণধর্ষনের ঘটনা নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে গত দুই দিন ধরে ধারাবাহিক সত্য ও বস্তুনিষ্ট রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারীবাহিনীসহ প্রশাসনে তোলপার শুরু হয়।
পুলিশ জানায়, গণধর্ষনের শিকার ঐ ছাত্রী বংশাই স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। বাড়ি আজগানা ইউনিয়নের বেলতৈল গ্রামে। ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সে রেজিস্ট্রেশন করেছে। অসহায় ঐ ছাত্রীর পিতা হাটুভাঙ্গা বাজারে পান বিক্রি করে পরিবারের ব্যয়-ভার নির্বাহ করে আসছে। ধর্ষিতার পিতা মামলায় উল্লেখ করেন, বেলতৈল, চিতেশ^রী ও হাটুভাঙ্গা বাজার এলাকার বখাটে সোহান, রাকিব ও জসিমসহ তাদের সহযোগিরা স্কুলে যাওয়ার পথে গত বুধবার তার মেয়েকে তুলে নিয়ে নাকে মুখে নেশা জাতীয় কিছু মিশিয়ে অজ্ঞান করে জসিমের বাড়িতে পালাক্রমে গণধর্ষন করে। গণধর্ষনের পর বখাটেরা তাকে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে চলে যায়। স্থানীয় লোকজন ঘটনাটি দেখে তার পরিবারকে খবর দেয়। খবর পেয়ে তারা মেয়েকে উদ্ধার করে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে আসে। ধর্ষনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের ভয়ে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেনি। এমনকি পুলিশকেও ঘটনাটি না জানিয়ে লোক লজ্জার ভয়ে মেয়েকে গোপনে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের মামার বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল।
গতকাল সোমবার এ নিয়ে দৈনিক ইতেফাকে বিস্তারিত তুলে ধরে রিপোর্ট প্রকাশ হয়। রিপোর্টের পর পরই নরেচড়ে বসেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল সোমবার পুলিশের মহা পরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. হাবিবুর রহমান ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের নির্দেশ প্রদান করেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারকে। টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মি. সঞ্জিত কুমার রায় অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে মির্জাপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মি. দীপংকর ঘোষ, টাঙ্গাইলের ডিবি (দক্ষিণ) ওসি মি. ম্যামল কুমার দত্ত, ও মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সায়েদুর রহমান, দেওহাটা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম রফিকসহ পুলিশের কয়েকটি টিম বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রভাবশালীদের চাপে পালিয়ে থাকা ভিকটিম ও তার পরিবারকে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করে। একই সময় গ্রেফতার করেছেন, ছাত্রী গণধর্ষনের মুলহোতা আতিকুল ইসলাম সিকদারের বখাটে ছেলে রাকিবুর ইসলাম সিকদার রাকিব(২৭), রফিকুল ইসলাম সিকদারের বখাটে ছেলে সোহানুর রহমান সোহান সিকদার(২৬)। এছাড়া বখাটে রাকিবের পিতা ও বংশাই স্কুল এন্ড কলেজের কলেজের সভাপতি এবং টাঙ্গাইল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর তিন বারের পরিচালক ও আজগানা ইউনিয়নের ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আতিকুল ইসলাম সিকদার এবং বখাটে সোহানুর রহমান সোহান সিকদারের পিতা ও আজগানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সিকদারকে প্রাথমিক জ্ঞিাসাবাদের জন্য পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের দুইজনকে আজ মঙ্গলবার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।। অপর ধর্ষনকারী মো. জসিমকে পুলিশ এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মি. সঞ্জিত কুমার রায় ও টাঙ্গাইল ডিবি পুলিশ (দক্ষিণ) শ্যামল কুমার দত্তের সঙ্গে আজ সোমবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, গতকাল সোমবার রাতে ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মুলহোতা রাকিব ও সোহানকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে আনা হয়েছে। ধর্ষিতা ছাত্রীকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জবানবন্দি ও বয়স রেকর্ড করা হয়েছে। শারীরিক ভাবে সে অসুস্থ্য থাকায় দুই এক দিনের মধ্যে তার ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। অপর দুই আসামী জসিম ও তার পিতা ইয়াকুব আলীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে সঠিক সময়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মি. সঞ্জিত কুমার রায়, নিরীহ ধর্ষিত ঐ ছাত্রীর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত, মামলা রেকর্ড এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও আইনের আওতায় আনায় এলাকাবাসি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞা জানিয়েছে। এছাড়া ধর্ষনকারীরা গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here